কবিতা | দিদিমনি | লেখক | কবি বাসন্তী

দিদিমনি কত পথ পাড়ি দিব আমি
দু’চোখের জল শুকিয়ে যে মরুভুমি।

তেইশ বছর শুধু অপেক্ষায় বসি
আরো কত দিন অজানায় শেষে বাসি।

তোমার স্মৃতির পাতা খুঁজিবার জন্যে
পাগলের মত ঘুরি জীবন অরণ্যে।

মনে পড়ে যাহা-তাহা দেখি বারেবারে
ভুলিনি হাসতে তুমি বড় চুপিসারে।

ভুলিনি তোমার নেচে-নেচে গান করা
বলতে আরও কত স্বরচিত ছড়া।

গাঁদা ফুল ছিড়ে মালা গাথা হলে শেষ
বাঁধবে মাথায় মানাবে তাহার কেশ।

পরনে তাহার হলুদ রঙের শাড়ি
গেরামের বধূ হবে তাই যত আড়ি।

পরীর মতন রুপটি তাহার জানি
পাড়ার ছেলেরা এই নিয়ে কানাকানি।

চোখের পাতায় বহু আবেগী চাহনি
আত্ম সংযমী তবু ছিল দিদিমনি।

মুখখানি তার বড়ই মায়াবী লাগে
কাঁচা সবুজের ঘ্রাণে সারাদেহ জাগে।

টোলপড়া হাসি,ঠোঁট তার অবিনাশী
গাঁয়ের লোকেরা আদর করতো বেশি।

রোজ সকালের নাস্তা খাওয়ার আগে
হাজার বায়না, না দিলে মরবে রাগে।

সহ্য করি সব কিছুই বলিনি তারে
ভালবাসি খুব এই ছোট্ট অধিকারে।

রোদেলা দুপুরে জামা-প্যান্ট নিয়ে ঘাটে
গোসল করবে,তবে পানি যে ঘোলাটে।

তবু দিদিমনি ফিরতো বৈকাল শেষে
নানা অজুহাতে, বয়ান করতো হেসে।

বুঝিবার সাধ্য হয়নি কখনো কারো
নিজেকে বলতো মন তুমি এত পারো।

উপস্থিত বুদ্ধি প্রশ্ন গাঁয়ে কোন মেয়ে
সবাই কদর করতো দিদির নিয়ে।

বিরাট স্বভাব মাঝে মধ্যে ঠাট্টা করা
কিভাবে করবে দিতো না কখনো ধরা।

দিদিমনি কত দিবে সান্তনার বাণী
অনেক হয়েছে আর নয় দিদিমনি।

এ সব তো শুধুমাত্র কৈশরের কথা
আরও বলবো লাগলেও প্রাণে ব্যাথা।

টাকার অভাবে পড়তে পারিনি দিদি
বিয়ে দিবে তাড়াতাড়ি সবার আকুতি।

বিয়ের বয়স এখনো অনেক বাকী
অভাব বলেছে, কি হবে ভেবে একাকী।

সমাজ বোঝেনি করেছে নানান ভান
যার জ্বালা সেই বোঝে মিথ্যে অপমান।

সখ ছিল বড় হয়ে নাট্য শিল্পী হবে
সকলে সাদরে ভালবাসা দিয়ে যাবে।

কিন্তু স্বপ্ন দেখা গরীবের নাহী সাজে
পৃথিবীর রুল মানতে হবে সহজে।

অবশেষে দিদি বিয়ের পিড়িতে বসে
জীবন নামের সমাধান গুলো কষে।

উত্তর মেলেনি হৃদয়েতে মিথ্যে আশা
যায় যাক মান মিটুক বিয়ের নেশা।

শ্বশুর বাড়িতে অনেক রঙের জ্বালা
বিয়ে দিয়ে শেষ নয় দুঃখের পালা।

সারা দিনোমান খুটিনাটি কাজ করে
রাতের বেলায় আজ্ঞা থাকো অনাহারে।

স্বামী বেটা আস্ত কসাই চামার বোকা
বোঝেনা কিছুই অথচ সে একরোখা।

পিতামাতা সব এই দিক থেকে পাকা
বউ যাক চলে কারণ দেয়নি টাকা।

কথার ডাইরি রাখতো মনের ঘরে
দাদা আসিলেই বলে দিবে অগোচরে।

দাদা তার কবে আসে থাকে পথ চেয়ে
চেনা যদি কেউ দেখতো ধরতো পায়ে।

দাদা যেন তাকে একবার দেখে যায়
প্রশ্ন করি খুব কঠিন পৃথিবী ভাই।

হঠাৎ খবর এল দিদি আর নাই
যৌতুক কারণ এই বৃথা পরাজয়।

দৌড়ে গিয়ে দেখি শুধু দিদি শুয়ে আছে
পালিয়েছে স্বামী কেউ নেই তার কাছে।

নিষ্ঠুর সমাজ তাকিয়ে দেখছে তারা
কত গুলো মাছি দিচ্ছে দিদির পাহারা।

হৃদয় ভাঙ্গানো অস্পষ্ট কান্নার স্রোতে
লুটিয়েছে দাদা, দিদির নিয়ে দু’হাতে।

সেতো চলে গেছে আসবে না আর ফিরে
কষ্টের সিঁড়িতে দাদা বসে আছে নীড়ে।

পৃথিবী বলতে পারো কোন যাতনায়
অকারণে লক্ষ দিদির জীবন ক্ষয়।

অমাবশ্যা রাতে, মাঘি পূর্ণিমার চাঁদে
ভাসিয়েছি মন বসে অপেক্ষার ছাদে।

কখন আসবে দিদি সুখ আঙিনায়
ভাবি ক্ষণে ক্ষণে এ কেমন অভিনয়।

ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা এলে
দলিজায় বুঝি কেউ আসছে তাহলে।

চারিদিকে বহুরুপি মানুষের ঢল
দাদার বাড়িতে নেই কোন কোলাহল।

দাদা একা একা শূন্যতায় দিন গোনে
পাইনা খুঁজে জীবনের কোন মানে।

দিদিমনি কত দিবে সান্তনার বাণী
অনেক হয়েছে আর নয় দিদিমনি।

চিৎকার করি সজোরে ঘুমের ঘরে
অভিমানে ডাকে কেরে অবুঝ অন্তরে।

শোকার্ত স্বপন তাতে আছে দৃঢ় পণ
হায় খোদা দয়াময়! মানে যে মন।

সাজের বেলা হাটতে নদীর ধারে
দেখতাম বারেবারে,তাকিয়ে ওপারে।

দিদিমনি বুঝি এল হেথায় এবারে
কেঁদে মন সান্তনা কোড়াতো আহারে।

মৃত্যুই সবচে পৃথিবীর বড় সত্য
সবার মানতে হয়, না বুঝে অগত্য।

হায় খোদা তুমি পরম দয়ালু জানি
দোয়া করি যেন স্বর্গে থাকে দিদিমনি।

দিদি মরীচিকা এক কাল্পনিক ছবি
দিদির জন্যেই আমি বাস্তবিক কবি।

দিদিমনি কত দিবে সান্তনার বাণী
অনেক হয়েছে আর নয় দিদিমনি।

2 thoughts on “কবিতা | দিদিমনি | লেখক | কবি বাসন্তী

Leave a Reply